বাঘারপাড়ায় মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প দেড় কোটি টাকার সিংহভাগ লোপাটের অভিযোগ

0
142

স্টাফ রিপোর্টার, বাঘারপাড়াঃ প্রশাসনের যথাযথ তদারকী না থাকায় বাঘারপাড়ায় দায়সারাভাবে শেষ হয়েছে মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পের কার্যক্রম। যথাযথ দেখভাল না হওয়ায় এ প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ভেস্তে গেল। এ ব্যাপারে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে নানাবিধ অনিয়মের অভিযোগ। প্রকল্পের দেড় কোটি টাকার সিংহভাগ লোপাটের অভিযোগ।

দেশব্যাপি অক্ষর জ্ঞানহীন মানুষের মাঝে স্বশিক্ষিত ও জ্ঞান বিকাশের লক্ষ্যে মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প (৬৪ জেলা) চালু করেন বর্তমান সরকার। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে জীবন দক্ষতাভিত্তিক মৌলিক সাক্ষরতা প্রদান করা।

৬ মাস মেয়াদি এ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয় গত ২০১৮ সালের ১৭ই ডিসেম্বর থেকে। বাঘারপাড়ায় গড়ে উঠেছিল ৩’শ পাঠদান কেন্দ্র। নিয়োগ করা হয়েছিল ৩’শ পুরুষ ও ৩’শ মহিলা শিক্ষক। শিক্ষণকেন্দ্র পরিদর্শনের জন্য রয়েছে ১৫ জন সুপারভাইজার। কর্মসূচির নিয়মিত পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য রয়েছেন একজন কর্মকর্তা। সংগ্রহে ছিল ১৮ হাজার শিক্ষার্থী । প্রতিদিনের পাঠদান কাল ছিল কমপক্ষে ২ ঘন্টা । শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জন যাচাই এর জন্য আমাদের চেতনা প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড। তিন মাস অন্তর চেতনা প্রথম খন্ড যাচাই ”মধ্যবর্তী” কোর্স দ্বিতীয় কোর্স সমাপনান্তে শিক্ষার্থীর চুড়ান্ত মূল্যায়ন। এরই অংশ হিসাবে ১ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

গত ১৭ ডিসেম্বর প্রকল্পটি শুরু হয়ে এবং ১৬ জুন ২০১৯ তা শেষ হয়েছে। এদিকে ১৬/০৬/১৯ তারিখে যশোর জেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো সহকারি পরিচালক মুহম্মদ বজলুর রশিদ স্বাক্ষরিত এক পত্রে আরো ১০ দিন পাঠ দান অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে। সে হিসাবে ৩০ জুন প্রকল্পটি শেষ হয়েছে।

এ উপজেলায় প্রকল্পের দায়িত্বভার ও দেখাশুনা করেন উপজেলা প্রোগ্রাম অফিসার শেখ মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও এনজিও দিশা সমাজ কল্যাণ সংস্থার কর্মকর্তা জোবায়ের হোসেন (চয়ন) । কিন্তু এ কার্যক্রম কিছুদিন যেতে না যেতেই তা ঝিমিয়ে পড়ে। এমন ও কেন্দ্র আছে যেখানে একদিন ও পাঠ দান হয়নি। সবই আছে খাতা কলমে। স্থানীয়দের অভিমত শিক্ষা ও পাঠদান কিছুই হয় নি বললেই চলে। আর এর সমুদায় দায়ভার পড়েছে ওই দুই কর্মকর্তার ওপরে । এদিকে অভিযোগ রয়েছে ”মধ্যবতী ” কোর্স শিক্ষকরা নিজেরা খাতা তৈরি করে জমা দিয়েছে উপজেলা কর্মকর্তাদের কাছে।

ধুপখালি একটি কেন্দ্রের শিক্ষক বজলুর রশিদ বলেন, এ ছয় মাসে ৩০টি কলম ও ৩০টি খাতা পেয়েছি। চক পেয়েছি। ছয় মাসে দুই হাজার ১শ৬০ টাকা বেতন এবং পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণে এক হাজার ৫০০ টাকা ভাতা পেয়েছি। ৯ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকলেও কমিটির কেউ জানেনা এ প্রকল্পের কার্যক্রম সম্পর্কে। ঈদের আগে ও পরে উপজেলার অন্তত দেড় ডজন শিক্ষণকেন্দ্র ঘুরে একটিও খোলা পাওয়া যায়নি।

এ সময় বাড়িতে গিয়ে কথা হয়েছে শিক্ষকদের সঙ্গে। তাঁরা জানান, শুরুতে কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষণ কার্যক্রম ভালো ছিল কিন্তু এক- দুই মাস পর থেকে এর কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়তে শুরু করে। সরেজমিন পরিদর্শন কালে দেখা গেছে, অতিরিক্ত দশদিন পাঠ দান অব্যাহত রাখার কথা থাকলেও অধিকাংশ কেন্দ্র খোলা পাওযা যায়নি।

গত ২৯ জুন, বিকাল তিনটা হতে পাঁচটা পর্যন্ত নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের ধুপখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দয়ারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাঁচবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ধলগ্রাম ইউনিয়নের আগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আগড়া আবাসন কেন্দ্র খোলা পাওয়া যায়নি।

এসময় শিক্ষকদের সাথে মোবাইলে কথা বললে কারো বিবাহ হয়ে গিয়েছে, অনেকে বাড়ি রয়েছে, কেও ডাক্তার দেখাতে গিয়েছে। দয়ারামপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মহিলা কেন্দ্রের শিক্ষক নাছরিন নাহারকে বিকাল ৪ টার সময় মুঠোফোনে কল করে কেন্দ্র বন্ধ থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বাড়ি থেকে বলেন, এত দিন পর খোজ নিচ্ছেন কেনো। বাঘারপাড়ার পৌর এলাকার আইডিয়াল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাছুমা খাতুন জানান, রমজানের পর থেকে ৫/৭ দিন পাঠ দান হয়েছে। চূড়ান্ত মূল্যায়ন নেওয়া হয়নি। প্রথম দিকে ১০, ১২ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকলেও পরে কম হয়ে যায়। একই অবস্থা পুরুষ কেন্দ্রের। গত ২৬ জুন সন্ধ্যা সাতটা হতে রাত নয়টা পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেল বাঘারপাড়ার মহিলা আলিম মাদরাসা , দোহাকুলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাধা গোবিন্দ মন্দির, পূর্বপাইকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম পাইকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ইন্দ্রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রগুলো বন্ধ রয়েছে ।

বাঘারপাড়া পৌর এলাকার রাধা গোবিন্দ মন্দির কেন্দ্র বন্ধ থাকার কারণ জানতে চাইলে কেন্দ্র শিক্ষক তপন দেবনাথকে ৮টা ১৫ মিনিটে ফোন করা হলে তিনি বলেন গত ১৬ জুন পাঠদান শেষ করা হয়েছে। অতিরিক্ত ১০ দিন সময় বাড়ানো হলেও আপনি কেন পাঠদান করাচ্ছেন না ? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন ,আমি কোনো চিঠি পাই নি। এজন্য পাঠদান চলছেনা।

এদিকে অনুসন্ধানে আরো অভিযোগ রয়েছে, চূড়ান্ত মূল্যায়ন পরীক্ষা ছাড়াই অনেক শিক্ষক নিজেদের মতো করে মার্ক জমা দিয়েছে উপজেলা কর্মকর্তাদের কাছে। অনেক কেন্দ্রে যেয়ে একই হাতের লেখা খাতা প্রমানিত হয়েছে। জয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কেন্দ্র শিক্ষক সাব্বির হোসেনের কাছে পরীক্ষার খাতা দেখতে চাইলে তিনি একই হাতের লেখা ৩ টাকা দামের খাতার এক এক পৃষ্টা এনে দেখান। পরীক্ষার কেউ এই ভাবে নেয় ? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কি করব ভাই , এইভাবে নিয়ে ফেলেছি। দরাজহাট ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের সচেতন নাগরিক পল্লি চিকিৎসক আখতারুজ্জামান জানান, এই প্রকল্পের কোনো কার্যক্রম আমার চোখে পড়েনি। শুধুমাত্র পাইকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে একটা ব্যানার ঝুলানো আছে।
অনুসন্ধানে আরো বেরিয়ে আসছে, গত ২৩ জুন উপজেলা প্রোগ্রাম অফিসার শেখ মোহাম্মদ নাজমুল হাসান শিক্ষার্থীদের পুরষ্কার দেওয়ার জন্য সোনালী ব্যাংক বাঘারপাড়া শাখা হতে ৫৫৯১৫৪৯ নং চেকের মাধ্যমে ১লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা উত্তোলন করলেও শিক্ষার্থীদের মাঝে পুরষ্কার দেওয়া হয়নি।

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা প্রোগ্রাম অফিসার শেখ মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী দিশা সমাজকল্যান সংস্থার কর্মকর্তা জুবায়ের হসেন জানান, ধান কাটার মৌসুম থাকায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম ছিল তাই কিছুটা সমস্যা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রসঙ্গে তিনি জানান, তারা যথাযথভাবে তাদের স্মমানী পাবেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.