মিয়ানমারে মানুষের চেয়ে অস্ত্র বেশি

0
72

চলমান রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ না করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ ভয়ঙ্কর সব অস্ত্র কিনতে শুরু করেছে মিয়ানমার।

রোহিঙ্গা নিপীড়নের প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নিজেদের অস্ত্র ভাণ্ডার আরও সমৃদ্ধ করছে অং সান সু চি’র দেশ। ইতোমধ্যে দেশটি চীন, রাশিয়া, ভারত ও ইসরায়েল থেকে প্রচুর প্রাণঘাতী ভারি অস্ত্র কিনেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিয়ানমার যে হারে অস্ত্র কেনা শুরু করেছে, তাতে মনে হতেই পারে- তবে কি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা? কারা দিচ্ছে মদদ? কারা দিচ্ছে এত অস্ত্র?

গেল মাসে বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভৌগোলিক অবস্থান ও অস্ত্রের বাজার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ওইসব দেশগুলো অস্ত্র বিক্রির ব্যাপারে মিয়ানমারকে ছাড় দিচ্ছে। অর্থনৈতিক অবরোধ শিথিল করলেও মিয়ানমারের কাছে এখনও অস্ত্র বিক্রি করছে না যুক্তরাষ্ট্র। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে সমর্থন দিয়ে আসা চীন দেশটির কাছে অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রেখেছে।

এদিকে চীনকে মিয়ানমারের অস্ত্রের প্রধান উৎস হিসেবে দাবি করেছে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই)। প্রতিষ্ঠানটির দেয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০১৭ এই বছরগুলোতে মিয়ানমারের কেনা মোট অস্ত্রের ৬৮ শতাংশ যোগান দিয়েছে চীন।

এর মধ্যে সাঁজোয়া যান, ভূমি থেকে আকাশের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের প্রযুক্তি, রাডার ও মানববিহীন ড্রোনের মতো অত্যাধুনিক প্রাণঘাতী ভারি ও ভয়ানক সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে।

চীনের বাইরে মিয়ানমারের পরম মিত্র রাশিয়াও এ ধরনের সহায়তা দিচ্ছে সু চি সরকারকে। গেল বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমার সফর করে ৬টি এসইউ-৩০ বিমান বিক্রি সংক্রান্ত চুক্তিতে সই করেন রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শুইগু। চুক্তিটি ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বলে গণমাধ্যমের প্রতিবেদেন জানানো হয়।

এ ধরনের চুক্তির নিন্দা জানিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর দাবি করেছিল- রাশিয়ার এই চুক্তি চলমান রোহিঙ্গা সঙ্কটকে আরও তীব্রতর করবে। যদিও তখন মার্কিন নিন্দায় কর্ণপাত করেনি রাশিয়া।

চীন-রাশিয়া ছাড়াও ভূ-রাজনৈতিক কৌশল ও আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বিগত বছরগুলোতে মিয়ানমারের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাড়িয়েছে ভারত। উদ্দেশ্য মিয়ানমারকে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য থেকে দূরে রাখা।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইসরায়েলের সঙ্গেও বহুদিনের বন্ধুত্ব মিয়ানমারের। রোহিঙ্গা সঙ্কটের মধ্যেও গেল বছর মিয়ানমারকে পানি বিশুদ্ধকরণ সিস্টেম প্রদান করে ইসরায়েল। তবে অভ্যন্তরীণ বিতর্কের মুখে ২০১৭ সালে মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রি সাময়িক বন্ধ করে দিয়েছিল দেশটি।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতা পূর্ববর্তী কাল থেকে সামরিক-বৌদ্ধতন্ত্রের প্রচারে রাখাইনে রোহিঙ্গা-বিদ্বেষ দানা বাঁধে। যার মহাবিস্ফোরণ ঘরে ২০১৭ সালের আগস্টে। প্রায় দুই বছর আগে সেই বিদ্বেষের জোরালো হলে রাখাইনের রোহিঙ্গাদের ওপর নেমে আসে নির্মম নিধনযজ্ঞ।

দেশটির সেনাবাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গাদের হত্যা-ধর্ষণ তাদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ কার্যক্রম সংঘটিত হয়। ওই সময় প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত আর সাগর পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয় প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা।

মিয়ানমার সেনাদের এই ‘নিধনযজ্ঞ’ দেশটির ওপর আন্তর্জাতিভাবে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আসে। বেশ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। অথচ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই নিজেদের অস্ত্রের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে চলেছে মিয়ানমার সেনারা।

আর দফায় দফায় আলোচনা হলেও রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের আহ্বানে কার্যকরভাবে কোনও সাড়াই দিচ্ছে না সু চি সরকার।