যাবজ্জীবনে কতদিন কারাবাস, রায় যেকোনো দিন

0
90

 

যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাদণ্ড নাকি ৩০ বছর- এ সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে করা রিভিউ আবেদনের শুনানি শেষ হয়েছে। এ বিষয়ে যেকোনো দিন রায় ঘোষণা করবেন আপিল বিভাগ।

আজ বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এই আদেশ দেন। আদালতে রিভিউ অবেদনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন। তাঁকে সহযোগিতা করেন অ্যাডভোকেট শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

এ ছাড়া আদালতে এই মামলায় অ্যামিকাস কিউরি (আদালত-বন্ধু) হিসেবে মতামত তুলে ধরেন ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ, অ্যাডভোকেট আবদুর রেজাক খান ও আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন। তাঁরা প্রত্যেকে আদালতে যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছরের পক্ষে মতামত তুলে ধরেন।

এর আগে গত ১১ এপ্রিল ‘যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাদণ্ড’- এ সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে করা রিভিউয়ে আইনি মতামত তুলে ধরতে চার জ্যেষ্ঠ আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি (আদালত-বন্ধু) হিসেবে নিয়োগ দেন আদালত।

এ ব্যাপারে অ্যাডভোকেট শিশির মনির এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ২০১৩ সালে একটি মামলার রায়ে আপিল বিভাগের বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার নেত্বত্বে চার সদস্যের বেঞ্চ এই সিদ্ধান্ত দেন যে, যাবজ্জীবন সাজা মানেই ২২ বছর ছয় মাস। বেঞ্চের অপর সদস্যরা ছিলেন বিচারপতি ইমান আলী, আনোয়ার উল হক ও হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। অপরদিকে ২০১৭ সালে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেত্বত্বে চার সদস্যের অন্য একটি বেঞ্চ একটি মামলায় সিদ্ধান্ত দেন যে, যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাদণ্ড।

আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ‘আপিল বিভাগের সমসদস্য বিশিষ্ট দুটি বেঞ্চ যদি পরস্পরবিরোধী রায় দেন তাহলে কোনটি প্রাধান্য পাবে? এটি জানতে চেয়ে রিভিউ করেছিলাম। এখন সুপ্রিম কোর্টকে বলতে হবে যাবজ্জীবন মানে কত বছর? রায় কোনটি থাকবে।’

শিশির মনির এনটিভি অনলাইনকে আরো বলেন, এ ছাড়া উভয় রায় দেশের প্রচলিত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেননা জেলকোড এবং দণ্ডবিধির ৫৭ ধারা, প্রিজন অ্যাক্টের ৫৯ ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন মানে হলো ৩০ বছর। আর যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু হলে ফৌজদারি ৩৫ (ক) অকার্যকর।

২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের এক হত্যা মামলায় আপিল বিভাগের ৯২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে ‘যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু (ন্যাচারাল লাইফ) কারাবাস বলে মন্তব্য করেন আপিল বিভাগ। একই বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি ওই মামলার রায় ঘোষণার সময় আপিল বিভাগ বলেছিলেন, যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু (ন্যাচারাল লাইফ) কারাবাস। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন।

সে সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন এর প্রতিবাদ করেন। তিনি বলেন, দণ্ডবিধির ৫৭ ধারায় যাবজ্জীবন দণ্ড মানে ৩০ বছর কারাবাস। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা কারাগারে রেয়াত পেলে দণ্ড আরো কমে আসে।

প্রবীণ এ আইনজীবী প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘যদি আমৃত্যু কারাবাসই হয়ে থাকে তাহলে এদের রেয়াতের কী হবে?’

‘আমি আরো বলেছি, প্রধান বিচারপতির এ মন্তব্য যেন মূল রায়ে না থাকে। এটা যদি থাকে তাহলে সব আসামির ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য হবে’, যোগ করেন খন্দকার মাহবুব।

মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০০৩ সালের ১৫ অক্টোবর একটি হত্যা মামলায় দুই আসামি আতাউর মৃধা ওরফে আতাউর ও আনোয়ার হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। এরপর ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল ও মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) শুনানির জন্য হাইকোর্টে আসে। এসব আবেদনের শুনানি নিয়ে ২০০৭ সালের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্টের রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। হাইকোর্টের সে রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিল বিভাগে আপিল আবেদন জানান।

২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের দেওয়া রায়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একইসঙ্গে আদালত যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু কারাবাসসহ সাত দফা অভিমত দেন। এরপর আপিলের ওই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন।