বিদায় ‘ইয়র্কার কিং’ মালিঙ্গা

0
83

অন্যসব কর্মব্যস্ত শুক্রবার হলে টস খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ হতো না; কিন্তু এই দিনটা ছিল ভিন্ন। লাসিথ মালিঙ্গার শেষ ম্যাচ বলে কথা। ম্যাচের শুরু থেকে যা অবস্থা, তাতে এই ম্যাচে বাংলাদেশ যদি যদি জিততো এবং ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিতো- তাহলে মালিঙ্গাকে জীবনের শেষ ১০ ওভার বল করতে হতো প্রেমাদাসার অর্ধেক গ্যালারির সামনে। বিষয়টা হয়তো খুব বেশি কিছু মনে হতো না, তবে দৃষ্টিকটু তো লাগতোই।

তবে ব্যাপারটা ঘটেছে ভিন্ন। বাংলাদেশ টস জেতেনি। প্রথমে ব্যাট করারও সুযোগ পায়নি। টস জিতে শ্রীলঙ্কা যখন ব্যাট করতে নামলো, তখন গ্যালারি ছিল অনেকটাই ফাঁকা। কর্মব্যস্ত মানুষ নিজেদের কাজ ছেড়ে ওই সময় গ্যালারিতে উপস্থিত হতে পারেননি। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে গ্যালারিতে মানুষ এসেছে এবং ইনিংসের শেষ দিকে মালিঙ্গার ব্যাটিংটাও দেখতে পেরেছে।

গ্যালারিতে দর্শকরা এসেছে মূলতঃ ম্যাচের মাঝ পথে। শ্রীলঙ্কার ৪৯তম ওভারের দিকে দেখা গেলো গ্যালারি প্রায় পূর্ণ। অর্থ্যাৎ, ওই সময়টায় স্বাগতিক শ্রীলঙ্কাও বড় একটা স্কোর চাপিয়ে দিতে পেরেছে প্রতিপক্ষ বাংলাদেশের ওপর।

বাংলাদেশ যখন ব্যাট করতে নামলো আর প্রেমাদাসায় তখন উপস্থিতি কানায় কানায় পূর্ণ। মানুষ ওই সময় গ্যালারিতেই উপস্থিত হয়েছে কেবল তাদের প্রিয় মালি’র (মালিঙ্গা) জীবনের শেষ ১০টি ওভার দেখার জন্য। মালিঙ্গার সেই এক্সপ্রেস ডেলিভারি, গতিময় এবং বলের পর বল ইয়র্কার ছুঁড়ে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানের স্ট্যাম্প উপড়ে ফেলার দৃশ্য শেষ বারের মত দেখার জন্য।

মালিঙ্গা যখন মাঠে নামছিলেন (ফিল্ডিংয়ের সময়), সতীর্থরা ব্যাটের পর ব্যাট সাজিয়ে গার্ড অব অনার দিয়ে রাজকীয় বিদায় সম্ভাষন জানালেন তাকে। তার মত একজন কিংবদন্তী এবং বিশ্বজয়ী পেসারকে এভাবে বিদায় জানানোটাও যে সমর্থকরা নিজেদের জন্য সৌভাগ্যেরই মনে করলেন! তারাও উঠে দাঁড়িয়ে একযোগে করতালির মাধ্যমে বিদায় জানালেন নিজেদের প্রিয় তারকাকে।

শুক্রবার নিজের ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে এসে মালিঙ্গা বলেন, ‘আমি খুব খুশি। উইকেট পাওয়ার চেয়েও বেশি খুশি। আমার এই শেষ ম্যাচটা দেখার জন্য এতগুলো মানুষ এখানে এসেছে। পুরো স্টেডিয়ামের গ্যালারি পরিপূর্ণ। আমি শুধু তাদেরকে ধন্যবাদ জানাতে চাই এবং তাদের কাছে কৃতজ্ঞ।’

শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটে এমন বিদায়টা আর কখনও এভাবে কারও ভাগ্যে জোটেনি। সেখানকার ক্রিকেটে এটা বিরল একটি ঘটনা। মুত্তিয়া মুরালিধরন, মাহেলা জয়াবর্ধনে, কুমার সাঙ্গাকারা, চামিন্দা ভাস, মারভান আতাপাত্তু কিংবা নুয়ান কুলাসেকারা- কেউই এভাবে মাঠ থেকে বিদায় নিতে পারেননি। তারা বিদায় বলেছেন, যখন কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই দল থেকে বাদ দেয়া হয়েছে, এরপর।

কিন্তু মালিঙ্গাই এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয়ে থাকলেন। নিজের মাঠে গ্যালারিভর্তি দর্শকের সামনে নিজের বিদায়টা বলে দিতে পারলেন। যিনি সারাজীবনই প্রতিষ্ঠিতদের দ্বারা বিদ্রুপের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন নিজস্ব ভঙ্গি এবং স্বকীয়তা দিয়ে। এমনকি বিদায় বেলায় যে বক্তব্য তিনি দিয়েছেন, সেখানেও গতানুগতিক কোনো বাউন্ডারি ছিল না। প্রায় ২০ মিনিট কথা বললেন। এত লম্বা সময় ধরে বিদায়ী বক্তব্য দেয়ার সুযোগ আর কোনো লঙ্কান ক্রিকেটার কখনও পাননি।

বয়সটা ৩৬ ছুঁই ছুঁই। একজন পেস বোলারের জন্য এর বেশি লম্বা ক্যারিয়ার করা যায় না। মালিঙ্গাও পারলেন না। বিদায় বলে দিতে হয়েছে তাকে। যদিও শেষ বেলায়ও তিনি ছিলেন প্রথম জীবনের মতই বিধ্বংসী। তামিম ইকবাল কিংবা সৌম্য সরকারকে যেভাবে বোল্ড করেছেন, সেটা হয়ে থাকবে তার ক্যারিয়ারে ট্রেডমার্ক হয়ে। তার বিখ্যাত সেই ইয়র্কার দিয়ে।

পুরো ক্যারিয়ারে এ ধরনের উইকেট নতুন। অনেকবারই পেয়েছেন। নিখুঁত ইয়র্কার, এমনকি এক ওভারে প্রায় প্রতিটি বলকেই একই লাইন-লেন্থে রেখে ইয়র্কার দিয়ে যাওয়া আর কোনো বোলারের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। যেটা করতে পারতেন কেবল মালিঙ্গাই। ‘ইয়র্কার কিংতো তাকে এ কারণেই বলা হয়।

সম্ভবত শ্রীলঙ্কান সমর্থকদের চেয়ে মালিঙ্গাকে বিদায়ী স্যলুটটা সবচেয়ে বেশি জানালেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক, ওপেনার তামিম ইকবাল। আগেরদিনই সংবাদ সম্মেলনে এসে মালিঙ্গার প্রশংসায় মুখর হয়েছিলেন তিনি। পরেরদিন বোলিংয়ের শুরুতেই মালিঙ্গার প্রথম শিকারে পরিণত হলেন তামিম। মালিঙ্গার গোড়ালি বরাবর করা ইয়র্কারে বোল্ড তো হলেনই তামিম, সঙ্গে চিৎপটাং হয়ে পড়েও গেলেন। মালিঙ্গা এ সময় শুধু মুচকি হাসলেন। দেখে মনে হচ্ছিল, স্বপ্নের মাঝে বেঁচে থাকা একজন।

তামিমের পর সৌম্য সরকার। প্রায় একই রকম ডেলিভারি। তামিমের মতই গোড়ালি উন্মুক্ত করে রেখেছিলেন সৌম্য সরকার। প্রথম বলটা দিলেন ইয়র্কার। কোনোমতে ঠেকালেন সৌম্য। পরের বলটা আবারও ইয়র্কার। এবারও ব্যাট পেতে দিয়ে নিজেকে বাঁচালেন তিনি।

তৃতীয়টা আবারও ইয়র্কার। একেবারে সেকেন্ডটার মতো। এবার বল ছুঁড়তে ছুঁড়তে যেন মালিঙ্গা বলছিলেন, ‘আমি প্রতিদিনই এমন বল ছুঁড়তে পারি। তুমি কয়টা ঠেকাবে?’ এবার সত্যিই পারলেন না সৌম্য। স্ট্যাম্প উড়ে গেলো। পুরো গ্যালারি দাঁড়িয়ে গেলো। স্যালুট জানালো মালিঙ্গাকে।

ম্যাচের পর তামিম ইকবাল মালিঙ্গার ইয়র্কার নিয়ে বলেন, ‘সবাই জানে যে, তিনি সব সময়ই এমন কিছু করা করা তথা প্রতিটি বলেই ইয়র্কার দিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু এমন কিছু ডেলিভারি থাকে, যেগুলোতে সত্যি সত্যি আপনার কিছুই করার থাকে না।’

নিজের আউট নিয়ে তামিম বলেন, ‘আপনি যদি আমার ডিসমিসালটি দেখেন, তাহলে দেখবেন, বলটা একেবারে শেষ মুহূর্তে সুইং করেছে। তাহলে এটার সামনে আপনি কি করতে পারবেন? আমি নিজের সেরাটা দিয়েই চেষ্টা করেছি। আমি নিজের তৃতীয় বলেই উপলব্ধি করেছি যে, দুর্দান্ত একটি ইয়র্কার আমি ঠেকাতে পেরেছি। তবে আমি চিন্তা করেছি, হয়তো ওটাই আমার দিকে ছুটে আসা সেরা ইয়র্কার ছিল। এ ধরনের ডেলিভারির সামনে হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকাছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

২০০৪ সালে ডাম্বুলায় আরব আমিরাতের বিপক্ষে এশিয়া কাপে ওয়ানেড অভিষেক মালিঙ্গার। অভিষেকের পর থেকেই ক্রিকেট বিশ্ব জেনে গেছে চোখ বন্ধ করে ইয়র্কার ছুঁড়তে পারেন এই পেসার। বোলিং বৈচিত্র্যের জন্য শুরু থেকেই পরিচিত তিনি। তারওপর, এ নিখুঁত ইয়র্কার এর আগে আর কোনো বোলার এভাবে ধারাবাহিকভাবে দিয়ে যেতে পারেননি। শুধু তাই নয়, ডেড ওভারে নিশ্চিত তিনি ছিলেন ব্যাটসম্যানদের মৃত্যুদূত।

১৫ বছরের ক্যারিয়ারে খেলেছেন ২২৬টি ওয়ানডে। ইনজুরি তাড়া করে না ফিরলে ম্যাচ সংখ্যা আরও বাড়তে পারতো। তিনিই একমাত্র বোলার, যার নামের পাশে তিনটি হ্যাটট্রিক রয়েছে। যার দুটি আবার বিশ্বকাপে। সব মিলিয়ে ওয়ানডেতে উইকেট নিয়েছেন ৩৩৮টি। সেরা হলো ৩৮ রানে ৬টি। ৫ উইকেট ৮ বার এবং ৪ উইকেট নিয়েছেন ১১বার।

৩০ টি টেস্ট খেলে উইকেট নিয়েছেন ১০১টি। ৭৩টি টি-টোয়েন্টি খেলে নিয়েছেন ৯৭ উইকেট। ইকনোমি রেট ৭.২৯ করে।

বাংলাদেশের বিপক্ষে শুক্রবারের ম্যাচ দিয়ে বিদায় নিয়ে নিলেন ইয়র্কারের রাজা লাসিথ মালিঙ্গা। বিদায় ‘দ্য ইয়র্কার কিং’। আর কখনও দেখা যাবে না ঝাঁকড়া চুলের বাবরি ধুলিয়ে বৈচিত্র্যময় ভঙিতে ইয়র্কার ছুঁড়তে। বিদায় কিংবদন্তি।