সারাদেশে কঠোর অভিযানের প্রস্তুতি

0
39

 

সারাদেশে ক্যাসিনো, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া ব্যক্তিদের শনাক্তে তালিকা তৈরি করছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। দল ও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করে মাত্র কয়েক বছরে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাওয়া এই কথিত নেতাদের বিরুদ্ধে গোপনে তদন্তও হচ্ছে। সরকারি দলের নাম ব্যবহার করা সুবিধাবাদী নেতা ও দলে অনুপ্রবেশকারী দুর্নীতিবাজ, টেন্ডারবাজি ও জমি জবর-দখলসহ নানা অপরাধে জড়িত এসব ব্যক্তিকে পাকড়াও করতে চলমান শুদ্ধি অভিযান শিগগিরই দেশব্যাপী শুরু হতে পারে। ঢাকার ক্লাব থেকে শুরু হওয়া আলোচিত এ অভিযান আরো জোরদার হবে বলে ইতোমধ্যে সরকারের শীর্ষমহল থেকে আভাস দেয়া হয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্র জানায়।

এদিকে দুর্নীতিবিরোধী সরকারের অভিযানকে ইতিবাচক বলেছেন বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, নিজ দলের মধ্যে থেকে এমন অভিযান নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। অতীতে দেশে এমনটা দেখা যায়নি। দল ও সরকারের ইমেজ রক্ষায় খুবই ভালো পদক্ষেপ। তবে অপরাধের পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। অভিযান শেষে এর সফলতা নিরূপণ করা যাবে। স্বার্থান্বেষী মহলের বাধায় যেন অভিযান মুখ থুবড়ে না পড়ে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাজধানীর ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো বিরোধী র‌্যাবের সাঁড়াশি অভিযানে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি কোটি কোটি টাকাসহ ধরা পড়েছেন। ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে চলা এমন দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির অভাব নেই। অভিযান শুরুর পর এদের অনেকে আত্মগোপনে গেছেন। আবার অনেকে গ্রেফতার এড়াতে দলের সিনিয়র নেতাদের কাছে লবিং করছেন। তবে তাদের শেষ রক্ষা নাও হতে পারে। কারণ তাদের কারণে সরকারের অনেক উন্নয়নমূলক ও মহৎ কাজ প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

সূত্রমতে, শুধু ঢাকায় নয়, বিভাগীয় শহর, জেলা শহর ও এমনকি উপজেলা পর্যায়েও এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন যারা বিগত ১০ বছরে শূন্য থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। এমন সুবিধাবাদী ব্যক্তিরা স্থানীয় নেতাদের ম্যানেজ করে সরকারি দল আওয়ামী লীগ, এর অঙ্গ সংগঠন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ ও ছাত্রলীগের পদপদবি ব্যবহার করে সব ধরনের অপকর্মে জড়িত। তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে টেন্ডারবাজি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, জোর করে অন্যের জমি দখলসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে আসছেন। টাকা ও পেশিশক্তি জোরের কারণে আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত ও পুরনো নেতাকর্মী তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতেও ভয় পান। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, সারাদেশে রাজনীতিকে ব্যবহার করে টাকার কুমির ও মূর্তিমান আতঙ্ক বনে যাওয়া ব্যক্তিদের তালিকা করা হচ্ছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মিলেছে। এদের অনেকেই নজরদারিতে আছেন। সরকারের উপর মহলের সবুজ সঙ্কেত পেলেই দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের ধরতে দেশব্যাপী অভিযান শুরু হবে। মাঠ পর্যায়ে দুর্নীতিবাজদের তালিকা তৈরিতে এসবি, সিআইডি, র‌্যাব, থানা পুলিশসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা কাজ করছেন।

একই সূত্রমতে, ঢাকায় পরিচালিত চলমান অভিযান শিগগিরই আরো গতি পাবে। গ্রেফতারকৃতদের মুখ থেকে অনেক বড় বড় দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির নাম বেরিয়ে এসেছে। তাছাড়া ঢাকায় আরো কয়েকশ’ ব্যক্তির তালিকা গোয়েন্দাদের কাছে রয়েছে। পর্যায়ক্রমে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। তবে অনেকেই দেশ ছাড়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, দুর্নীতি-অনিয়মের’ বিরুদ্ধে অভিযান যখন শুরু হয়েছে, এর শেষটাও দেখে নেয়া হবে। তিনি বলেন, সারা বাংলাদেশে যারা এ ধরনের অপরাধ অপকর্ম করবে, প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এটা তো একটা অভিযান চলছে, প্রতিদিনই কেউ না কেউ গ্রেফতার হচ্ছে, অনেকে নজরদারিতে রয়েছে। কেবল আওয়ামী লীগের দুর্নীতি নয়, অতীতে যারা ক্ষমতায় ছিল, তাদের কে দুর্নীতি করে কতটা সম্পদের মালিক হয়েছে সেটাও দেখা হবে।

তিনি বলেন, সরকারি দল নিজেদের ঘর থেকে শুরু করেছে, যেটা অতীতে কখনো হয়নি। বিএনপি আমলে একজনকেও শাস্তি পেতে হয়নি। অতীতে কেউ ক্ষমতায় থেকে শুদ্ধি অভিযান করেনি, যেটা শেখ হাসিনা করছেন। চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে এক দলীয় সভায় ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতাকে চাঁদাবাজির অভিযোগে সরিয়ে দেয়ার পাশাপাশি যুবলীগ নেতাদের নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ঢাকায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের তত্ত¡াবধায়নে ক্যাসিনো চালানোর খবর সংবাদমাধ্যমে এলে ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার বিভিন্ন ক্লাব ও বারে অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব অভিযানে ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সদ্য বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুইয়া, যুবলীগ নেতা দাবিদার টেন্টারবাজ গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম, কলাবাগান ক্লাব সভাপতি কৃষক লীগ নেতা শফিকুল ইসলাম ফিরোজ, মোহামেডান ক্লাব প্রধান ও বিসিবি পরিচালক লোকমান হোসেন ভুইয়া, গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক ও তার ভাই থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রূপন ভ‚ঁইয়া গ্রেফতার হন। এদের কাছ থেকে নগদ প্রায় ১০ কোটি টাকা, অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়।

সবশেষ মঙ্গলবার অনলাইন ক্যাসিনোর বাংলাদেশ প্রধান সেলিম প্রধানকে আটকের পর তার গুলশানের বাসা ও বনানী অফিস থেকে ২৮ লাখ টাকা, ২৩ দেশের মুদ্রা, বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ এবং ৮ কোটি টাকার চেকসহ নগদ টাকা উদ্ধার করে র‌্যাব।

এ ছাড়া চলমান শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর থেকেই ক্যাসিনো ও চাঁদাবাজির হোতা হিসেবে নাম বেরিয়ে আসে ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের নাম। আলোচিত-সমালোচিত এই যুবলীগ নেতাকে গ্রেফতার নিয়ে কয়েকদিন ধরে ধোঁয়াশা দেখা দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাবি করছে, সম্রাট নজরদারিতে আছেন। তার বিরুদ্ধে কী কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি গতকাল সংবাদিকদের এমন প্রশ্নে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, যিনি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তিনি নিজেই বলেছেন, ওয়েট অ্যান্ড সি। কাজেই একটু ওয়েট করেন, এত তাড়াহুড়ো করছেন কেন?’

এদিকে গোয়েন্দা সূত্র বলছে, সারাদেশে অভিযান চালাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মাঠ পর্যায়ে দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িত সরকারি দলে এক শ্রেণির সুবিধাভোগী নেতাদের নামের তালিকা চূড়ান্ত পর্যায়ে। এদের অনেকে বিগত সময়ে বিএনপি, জাতীয় পার্টি এমনকি জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গত কয়েক বছরে তারা সরকারি দলের নেতা বনে গিয়ে টাকার কুমির হয়েছেন।

এ ছাড়া অন্য দলেরও কিছু মাঠ পর্যায়ের নেতা রয়েছেন, যারা সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গে মিলেমিশে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত আছেন তাদের নামও তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। এসব অপরাধী ব্যক্তি রাজনীতিকে ব্যবসা হিসেবে ব্যবহার করে সম্পদের পাহাড় গড়ছেন। সরকারের উপর মহলের সিগন্যাল পেলেই শুরু হবে দেশজুড়ে অভিযান। এ ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। অন্যদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে কোনো দল ক্ষমতায় এলেই তারা ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সবকিছুর মালিক হতে চায়। বিগত সরকারগুলোর সময়েও এক শ্রেণির নেতা টাকার কুমির হয়েছেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগ লম্বা সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে তাদের এক শ্রেণির নেতাকর্মীর মধ্যে সেই প্রবণতা বেড়েছে। তারা বলছেন, ব্যবসা কেউ করতে চাইলেও নিজের রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে হবে এবং সেটা না থাকলে তাকে ক্ষমতাসীনদের প্রভাবের সঙ্গে সমঝোতা করে এগুতে হবে। দুর্নীতি দমনে সরকারের পাশাপাশি দুদকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।