জুন মাসেও পোশাক রফতানি বে‌ড়ে‌ছে

0
56

চলতি বছরের মার্চে বৈশ্বিক মহামারী কভিড-১৯-এর বড় ধাক্কা লাগে দেশের তৈরি পোশাক রফতানিতে। এপ্রিলে গিয়ে ব্যাপক হারে কমে যায় রফতানি। তবে মে মাস থেকে রফতানি পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হয়, যার ধারাবাহিকতা জুনেও অব্যাহত ছিল।

করোনার প্রভাবে চলতি বছরের মার্চে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাকের রফতানি কমে ২০ দশমিক ১৪ শতাংশ। এরপর এপ্রিলে কমে ৮৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর মে মাসে কমে ৬২ শতাংশ। জুনেও রফতানি কমার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেও ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হার আগের তুলনায় কম, ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে বিজিএমইএ জানিয়েছে, চলতি বছরের জুনে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক রফতানি (নিট ও ওভেন) হয়েছে ২১২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের। গত বছরের একই সময়ে রফতানি হয়েছিল ২৩৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারের পোশাক।

এদিকে এক অর্থবছর বিবেচনায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পোশাক পণ্যের মোট রফতানি ছিল ৩ হাজার ৪১৩ কোটি ৩২ লাখ ডলারের। ২০১৯-২০ অর্থবছরে পোশাক রফতানি হয়েছে ২ হাজার ৭৮৩ কোটি ৪০ লাখ ডলারের। এ হিসেবে সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে তৈরি পোশাকের রফতানি কমেছে ১৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

চীনের উহানে কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় গত ডিসেম্বরের শেষে। ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে তা বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ছড়িয়ে পড়ে। করোনার প্রভাবে দেশের তৈরি পোশাক খাত প্রথমে কাঁচামালের সরবরাহ সংকটে পড়ে। কারণ দেশে তৈরি পোশাক খাতের ওভেন পণ্যের আনুমানিক ৬০ শতাংশ কাপড় আমদানি হয় চীন থেকে। দেশটি থেকে নিট পণ্যের কাঁচামাল আমদানি হয় ১৫-২০ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে ধীরগতিতে হলেও কাঁচামাল সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও রফতানি গন্তব্যগুলোয় চাহিদার সংকট তৈরি হয়।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান রফতানি গন্তব্য আমেরিকা ও ইউরোপের প্রতিটি দেশই কভিড-১৯-এর ব্যাপক প্রাদুর্ভাব মোকাবেলা করছে। এ অবস্থায় একের পর এক ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত করেছে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো।

ক্রয়াদেশ বাতিল-স্থগিত করা ক্রেতাদের মধ্যে প্রাইমার্কের মতো বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানও আছে। আয়ারল্যান্ডভিত্তিক প্রাইমার্কের পাশাপাশি ছোট-মাঝারি-বড় সব ধরনের ক্রেতাই ক্রয়াদেশ বাতিল-স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। আবার এইচঅ্যান্ডএম, ইন্ডিটেক্স, মার্কস অ্যান্ড স্পেনসার, কিয়াবি, টার্গেট, পিভিএইচসহ আরো কিছু ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ক্রয়াদেশ বহাল রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। ফলে সামনের দিনগুলোয় ক্রয়াদেশ বাতিল-স্থগিতের পরিমাণ কমে আসতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। বৈশ্বিক লকডাউন পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের কারণে নতুন ক্রয়াদেশও আসতে শুরু করেছে পোশাক কারখানাগুলোতে। কারখানা মালিকরা বলছেন, বাতিল বা স্থগিত হওয়া ক্রয়াদেশগুলোর কিছু ফিরে এসেছে। আবার নতুন ক্রয়াদেশও পেতে শুরু করেছে কারখানাগুলো। কিন্তু তা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক কম।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ থেকে পোশাক ক্রয়কারী অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা অনেক অর্ডার প্লেস করছি। লকডাউন থেকে সচল হওয়ার পর আমাদের সব সরবরাহকারী নতুন ক্রয়াদেশ পেয়েছে।

ক্রয়াদেশ আগের তুলনায় কেমন—এমন প্রশ্নের উত্তরে ইউরোপভিত্তিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানটির কান্ট্রি ম্যানেজার বলেন, ভোক্তা আচরণে আমরা বড় ধরনের পরিবর্তন দেখছি। মানুষের অগ্রাধিকার বদলেছে। আমরা স্টোরগুলোতেও কম ভিড় দেখছি। অনলাইন বড় সফলতার ক্ষেত্র হলেও এক্ষেত্রে অনেক কাজ প্রক্রিয়াধীন। এদিকে লকডাউনে স্টোর বন্ধ থাকায় মজুদ পণ্য নিয়েও আমাদের কাজ করতে হচ্ছে। এ মুহূর্তে আমরা পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত, অনেক কাজ প্রক্রিয়াধীন।

ক্রয়াদেশ পরিস্থিতি নিয়ে পোশাক শিল্প মালিক সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, আজ পর্যন্ত পোশাকের বৈশ্বিক বিক্রির পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে পুনরুদ্ধারের কোনো ইঙ্গিত নেই। বিশ্বব্যাপী দেশগুলো অবরুদ্ধ বা লকডাউন পরিস্থিতি থেকে পুনরায় সচল হওয়া নিয়ে লড়াই করছে। এটা আমাদের জন্য খারাপ সতর্কবার্তা। কারণ পোশাক শিল্প পশ্চিমা বাজারের চাহিদার ওপর নির্ভরশীল।

যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকের খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রগুলোর বিক্রি গত বছরের এপ্রিলের তুলনায় চলতি বছরের এপ্রিলে ৮৭ শতাংশ কমেছে। মে মাসে কমেছে ৬৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ—এমন তথ্য জানিয়ে বিজিএমইএ প্রতিনিধিরা বলছেন, আমাদের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে কারখানাগুলোর গড় সক্ষমতার ৫৫ শতাংশের মতো ক্রয়াদেশ আছে, যা বছর শেষে বাড়তে পারে। ২০২০-এর ডিসেম্বরের মধ্যে সক্ষমতার ৭০ শতাংশ ক্রয়াদেশ হতে পারে। এ ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবসম্মত না-ও হতে পারে, তার পরও আমরা ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে নিয়মিত রফতানির ৮০ শতাংশ হবে এমন আশা করতে পারি।

বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বণিক বার্তাকে বলেন, এ বছরের মার্চ থেকে আমাদের পোশাক রফতানিরও অবাধ পতন ঘটছে। জুনে অবস্থা তুলনামূলক ভালো হবে বলে আমরা আশা করেছিলাম। বাস্তবেও পতনের হার কমে এসেছে। গত বছরের জুনের তুলনায় প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ কমেছে জুনের রফতানি। ক্রয়াদেশ আসছে স্বাভাবিক প্রবাহের ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের (২০১৯-২০) শুরু থেকেই রফতানি নিয়ে কিছুটা খারাপ সময় পার করছিল তৈরি পোশাক খাত। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে (জুলাই) পোশাক রফতানি বেড়েছিল আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। এর পরের মাসেই বড় ধরনের পতন হয় পোশাক রফতানিতে। সে সময় রফতানি হ্রাস পেয়েছিল ১১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। রফতানিতে এ নেতিবাচক ধারা বজায় থাকে নভেম্বর পর্যন্ত। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বরে তৈরি পোশাকের রফতানি হ্রাস পেয়েছিল যথাক্রমে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ, ১৯ দশমিক ৭৯ ও ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

এরপর ডিসেম্বরে কিছুটা ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসে তৈরি পোশাক রফতানি। ওই সময় বাংলাদেশ থেকে পণ্যটির রফতানি বেড়েছিল আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ২৬ শতাংশ। কিন্তু জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ধসের ধারায় রয়েছে তৈরি পোশাক রফতানি।

চলতি বছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে পোশাক রফতানি ৫০০ কোটি ডলার হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল পোশাক শিল্প মালিক সংগঠন বিজিএমইএ। সেই আশঙ্কা প্রায় পুরোটাই বাস্তবে রূপ নিয়েছে।