রোহিংগা ইস্যু, বাংলাদেশ এবং বৈশ্বিক ভাবনা

0
115

রোহিংগা ইস্যু, বাংলাদেশ এবং বৈশ্বিক ভাবনা


এটা নিশ্চিত বাংলাদেশ একটা গভীর সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক ভাবে। বড় ধরণের গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে, শত্রু মিত্র উভয়ের উপরই সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের ছাত্র ছিলাম তাতে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সংকট সম্পর্ক যতটুকু গবেষণা করেছি বুঝতে পারছি কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বড় দেশ গুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় কূটনৈতিক চাল চেলেছে।

ভারত কে বন্ধু রাষ্ট্র ভাবছি, কিন্তু ভারত স্পষ্ট বলেছে তারা রোহিঙ্গা সন্ত্রাসের বিপক্ষে, একটিবার ও বলে নি মায়ানমার রোহিংগা নিধন করে মানবতা বিরোধী কাজ করছে। মোদি মায়ানমার ভ্রমণে গিয়েছেন, ভারতের অর্থায়ন এ নির্মিত প্যাগোডা উদ্ভোধন করছেন, রাখাইন রাজ্যে ভারত সরকার এর দুইটি বড় প্রকল্প এর অনুমোদন পেয়েছে তার দেখভাল করছেন, আর পাশাপাশি রোহিঙ্গা নিধন করতে গিয়ে যেন একজন ও হিন্দু ও নিধন না হয় সেই বিষয়ে সতর্ক হতে বলেছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট বলে দিয়েছেন তারা নতুন রোহিংগা নিতে আগ্রহী নয় বরং ভারতের ক্যাম্পে অবস্থানরত চুয়াল্লিশ হাজার রোহিংগা ফেরত দিতে বদ্ধ পরিকর। রোহিংগাদের পক্ষে কথা বলে মায়ানমারে নতুন নতুন প্রজেক্ট পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করবে না ভারত বরং বার্মিজ দের পক্ষ নিয়ে চীন এর একক আধিপত্যে ভাগ বসাবে ভারত।

চীন মায়ানমার এর বিপক্ষে যাবে না কখনো, কারণ রাখাইন রাজ্যে বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর হচ্ছে চীনের সহযোগিতায় যার ৮৫% মালিক চীন। এছাড়া মায়ানমার এর অর্থনীতি ও রাজনীতির প্রধান পৃষ্ঠপোষক হল চীন। সমগ্র মায়ানমার এ অধিকাংশ বড় প্রজেক্ট চীনের অর্থায়ন এ নির্মিত। সামরিক জান্তা সরকার এর সাথে চীন এর সম্পর্ক অত্যন্ত ভাল। সম্প্রতি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দিকে মায়ানমার কে ধাবিত করে চীন কে একহাত দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত।এরপর ও চীন তার আধিপত্য ধরে রেখেছে, এবং মায়ানমার এর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে বংগোপসাগরের উপর বিচরণ এর সুযোগ কিছুতেই হারাবে না চীন। তবে বাংলাদেশ কে ও সহজে চটাবে না চীন, এই দেশে তাদের লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ তা তাদের অনেক কিছু থেকে দূরে রাখবে।

পাকিস্তান মুসলিম রাষ্ট্র হলে ও তারা চীন এর বলয়ের বাইরে যাবে না। লাখ লাখ রোহিংগা মরলে ও তাদের কিছু যায় আসে না, বরং তারা অধিকতর নজর দিচ্ছে মায়ানমারে অস্ত্র রপ্তানি করতে চীনের সাথে যৌথ ভাবে। তাদের আরেকটি অন্যতম উদ্দেশ্য হল বাংলাদেশ কে অস্থিতিশীল করে তোলা এবং আওয়ামীলীগ সরকার পতনের।

ইসরাইল কে মায়ানমার সব সময় পাশে পাবে। রোহিংগা নিধনের অন্যতম কুশীলব ইসরাইল। তারা মায়ানমার সেনাবাহিনী কে সামরিক প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সমর্থন নিয়ে দিচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়া,তুরস্ক এবং মালয়েশিয়া এই তিন দেশ মুসলিম দেশ গুলোর মধ্যে নব্য জুটি। এরা যে কোন মুসলিম শরণার্থী এবং রোহিংগাদের প্রতি খুবই সহনশীল। তুরস্ক একটা সময় মুসলিম সাম্রাজ্য এর নেতৃত্ব দিত, তারা সেই হারানো গৌরব ফিরে পেতে চায়, আর তাতে তাদের যোগ্য সহযোগী ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া সহ সৌদি বিরোধী বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশ। তাই তারা মুসলিম জাহানের মন জয় করতে চাইছে। তারা সাহায্য সহযোগিতা পাঠাতে চায় ব্যাপকহারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। আজ বাংলাদেশ সরকার এর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর সাথে এই দেশগুলোর প্রতিনিধিদের মিটিং রোহিংগা সমস্যা বিষয়ে। যেহেতু কয়েকলাখ রোহিংগা ইতিমধ্যে ঢুকে পড়েছে বাংলাদেশে এবং তাদের কে আপাতত মায়ানমার পাঠানোর সুযোগ নেই তাই সরকারের উচিত হবে সঠিক তালিকা নির্ণয় করে তাদের নির্দিষ্ট ক্যাম্পে আবদ্ধ রাখা, যেন কোন ভাবেই তারা সাধারণ জনগণের সাথে মিশে যেতে না পারে। আর সমস্ত খরচ নিতে হবে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা কে।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও রাশিয়া এই দেশ গুলোকে বুঝা বড় দায়। তারা চাইবে মায়ানমার এ চীনের আধিপত্য কমাতে, বংগোপসাগরে নিজের অবস্থান গাড়তে, বাংলাদেশ এর সেন্টমারটিন এর দিকে ও বিশেষ খেয়াল তাদের। তারা ঝোপ বুঝে কোপ মারবে।

কানাডা, নেদারল্যান্ড ও অন্যান্য শান্তিকামী দেশ গুলো এই রোহিংগা নিধনের বিপক্ষে। তারা ইতিমধ্যে নিন্দা জানিয়েছে।

সবচেয়ে রহস্যময় চরিত্র হল সৌদি আরবের, তারা বিশ্ব শান্তির জন্য হজ্বে দোয়া করেন, কিন্তু রোহিংগা নিধনের ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেয় না।

মায়ানমার চায় সব রোহিংগা বাংলাদেশ এ পাড় করে দিয়ে রাখাইন রাজ্য কে নিজের মত করে সাজাতে বৈদেশিক অর্থায়ন এ। বাংলাদেশ এর অনেক যুক্তিবাদী রোহিংগাদের বিরোধী হতে গিয়ে মায়ানমার আর বর্মী মগদের পক্ষ নিয়ে নেয়, পরোক্ষভাবে সাপোর্ট দেয় এই হত্যাকান্ডের। উনারা যুক্তি দিয়ে বলেন মায়ানমার এর অন্যরাজ্যে বসবাসরত মুসলিমরা ভাল আছে, রোহিংগারা নিজেদের দোষে মরছে, ওরা আগে হামলা করে তাই ওদের এভাবে মারা উচিত। আপনারা বলুন তো অন্যরাজ্যে মুসলমান অধ্যুষিত এলাকার নাম কি কি? রোহিংগাদের কে তারা বাংগালি বলে মারে কেন? এই হামলা কবে থেকে শুরু, মগেরমুল্লুক সম্পর্কিত কি কি জানেন আপনি? বাংলাদেশে কোন এলাকায় জংগী পেলে কি ওই এলাকার সবাইকে মেরে ফেলা হয়, নাকি প্রশাসন অত্যন্ত সফলতার সাথে জংগীদের একেক করে ধরে দেশ কে শান্তিপূর্ণ রাখছে? রোহিঙ্গা দের কয়টা মৌলিক অধিকার পূরণ করতে মায়ানমার সরকার সহযোগিতা করে, মানবাধিকার বলে কিছু কি আছে সেখানে? অনেকে আছেন আবার বেশি আবেগ তাড়িত হয়ে মায়ানমার এর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে দেন, একটি বার ও ভাবেন না তাতে দেশের কি ক্ষতি হবে,আর সমস্যার সমাধান হবে কিনা? ওপাড়ে মৃত্যুর ভয়, তাই এপাড়ে রোহিংগারা ছুটে আসবে স্বাভাবিক। আমার মনে হয় তাদের কে নোম্যানস ল্যান্ড এ স্থান দেয়া উচিত, সেখানে তাদের ক্যাম্প করে দিয়ে বৈশ্বিক সাহায্য নিয়ে বাংলাদেশ এর মাধ্যমে তাদের সহযোগিতা করা উচিত। তাইলে তাদের উপর নজরদারি ও করা যাবে, আমার দেশ এর ভূমি ও নিরাপদ থাকল। নয়তো একটা সময় এই রোহিংগারা পেটের দায়ে জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে যাবে।
কোন আন্তর্জাতিক চক্রান্তে পা দেয়া যাবে না, আর যেই রোহিংগারা ইতিমধ্যে ঢুকে পড়েছে তাদের জন্য বৈশ্বিক সাহায্য নিয়ে দ্রুত একটা নির্দিষ্ট জায়গা সিলেক্ট করে সেখানে রাখার বন্দোবস্ত করতে হবে, নয়তো তারা ছড়িয়ে পড়বে সারা বাংলায়। আর এ রকম সমস্যা গ্রস্থ জাতিকে ব্যবহার করে বিভিন্ন সন্ত্রাসী, জংগী গোষ্ঠী গুলো। আমরা তাদের প্রতি মানবতা দেখাব ঠিক আছে তবে নজরদারী ও রাখতে হবে যেন তারা অন্যায় কোন কাজে না জড়ায়।

লেখকোঃ নসরুল কবির কায়েম নিহাদ, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাবি।

Secretary General, Protest against Minority Torture in South Asia