
বাংলাদেশ মূলত একটি কৃষিনির্ভর দেশ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় আশি শতাংশ মানুষ গ্রামাঞ্চলে বাস করেন এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। দেশের মোট জিডিপির প্রায় বিশ শতাংশ আসে কৃষি খাত থেকে, আর সমগ্র শ্রমশক্তির প্রায় আটচল্লিশ শতাংশ কর্মসংস্থান এই খাতের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। এত বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকা যে খাতের সঙ্গে জড়িত, সেই কৃষিকেই যদি পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে তা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন এক গতি সঞ্চার করতে পারে। একেই বলা হচ্ছে কৃষি পর্যটন বা এগ্রো ট্যুরিজম, যেখানে পর্যটকরা শুধু দর্শনার্থী নন, বরং কৃষকের জীবনযাত্রা, ফসল উৎপাদনের প্রক্রিয়া এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির সরাসরি অংশীদার হয়ে ওঠেন।
বাংলাদেশে কৃষি পর্যটন খাতটি এখনো পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি, তবে বেসরকারি কিছু উদ্যোগ ইতিমধ্যে উদাহরণ সৃষ্টি করছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক ইকো ট্যুরিজম ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, যেখানে ফলবাগানকেন্দ্রিক গন্তব্যগুলো অবকাশযাপনের জনপ্রিয় স্থানে পরিণত হয়েছে। এর পাশাপাশি সিলেটের গোলাপগঞ্জে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি এগ্রো ট্যুরিজম প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যেখানে আনারস, কফি, মাল্টা, কমলা ও কাজুবাদাম বাগানকে কেন্দ্র করে গোটা উপজেলাকে পর্যটনের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এমনকি দেশের কিছু তরুণ উদ্যোক্তা সরাসরি খামার থেকে ফসল সংগ্রহের অভিজ্ঞতা দিয়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করছেন, যেখানে দর্শনার্থীরা নিজ হাতে মাঠ থেকে সবজি বা ফল তুলে নেওয়ার অভিজ্ঞতা পান। এই ছোট ছোট উদ্যোগগুলোই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে কৃষি পর্যটনের বাজার চাহিদা বাস্তবে বিদ্যমান।
কৃষি পর্যটনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কতটা বিশাল হতে পারে তার একটি হিসাব বাংলা নিউজ টোয়েন্টিফোরের একটি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে বাংলাদেশের প্রায় দুই কোটি কৃষক যদি সপ্তাহে জনপ্রতি ন্যূনতম দুই হাজার টাকা কৃষি পর্যটন থেকে বাড়তি আয় করতে পারেন, তাহলে তা গ্রামীণ অর্থনীতিতে যে বিপুল অর্থপ্রবাহ তৈরি করবে তা কল্পনাতীত। বাংলাদেশে ফসলের নিবিড়তা বর্তমানে দুইশ পাঁচ শতাংশে পৌঁছেছে, অর্থাৎ একই জমিতে বছরে একাধিকবার ফসল উৎপাদন হচ্ছে, যা কৃষি পর্যটনের জন্য সারা বছরই ভিন্ন ভিন্ন ফসলের ঋতুভিত্তিক আকর্ষণ তৈরির সুযোগ করে দেয়। ধান কাটার মৌসুম, সরিষা ফুলের ক্ষেত, চা বাগানের সবুজ ঢেউ কিংবা লিচু আম কাঁঠালের বাগান, প্রতিটিই আলাদা আলাদা কৃষি পর্যটন অভিজ্ঞতার সম্ভাবনা তৈরি করে।
কৃষি পর্যটনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি শহরকেন্দ্রিক পর্যটনের বাইরে গিয়ে সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থ প্রবাহিত করে। শহরের মানুষ যখন গ্রামে গিয়ে কৃষকের বাড়িতে থাকেন, স্থানীয় খাবার খান এবং কৃষি কাজে অংশ নেন, তখন সেই অর্থ সরাসরি কৃষক পরিবার ও গ্রামীণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছায়, যা বড় হোটেল বা করপোরেট পর্যটন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাধারণত ঘটে না। এতে একদিকে যেমন কৃষকের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়, অন্যদিকে তেমনি গ্রাম থেকে শহরমুখী অভিবাসনের প্রবণতাও কিছুটা কমতে পারে।
তবে এই খাতকে বাস্তবে কাজে লাগাতে হলে কয়েকটি বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। প্রথমত কৃষি পর্যটনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যাতে বিচ্ছিন্ন বেসরকারি উদ্যোগগুলো একটি কাঠামোর মধ্যে আসতে পারে। দ্বিতীয়ত গ্রামীণ এলাকায় ন্যূনতম মানসম্মত থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা এবং যোগাযোগ সুবিধা তৈরি করা জরুরি। তৃতীয়ত কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আতিথেয়তার দক্ষতা তৈরি করতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই এই পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমে। চতুর্থত সিলেটের গোলাপগঞ্জ মডেলের মতো নির্দিষ্ট ফসল বা এলাকাভিত্তিক ব্র্যান্ডিং তৈরি করে সেগুলোকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে পরিকল্পিতভাবে তুলে ধরতে হবে।
বাংলাদেশের কৃষি এমনিতেই বিশ্বে এক বিস্ময়কর সাফল্যের গল্প, চাল ও মাছ উৎপাদনে দেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে এবং সবজি উৎপাদনে তৃতীয়। এই কৃষি সাফল্যকে যদি পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে তা কেবল বাড়তি আয়ের উৎসই হবে না, বরং দেশের কৃষিসংস্কৃতি ও গ্রামীণ ঐতিহ্যকে বিশ্বের সামনে নতুনভাবে তুলে ধরার একটি সুযোগও তৈরি করবে। পরিকল্পিত নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে কৃষি পর্যটন বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
লেখক: মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।